ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার না করলে কি ঘটতে পারে

0
41

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত ভোটগণনায় যা দেখা যাচ্ছে – তাতে ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে গেছেন বলেই সবাই মনে করছেন।

কিন্তু মার্কিন সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবর: ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি পরাজয় স্বীকার করবেন না, এবং ”ভোটযুদ্ধের অনেক কিছুই এখনো বাকি আছে”।

প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার না করলে কী ঘটতে পারে?

‘এতে কিছুই এসে যায় না’

যুক্তরাষ্ট্রের আইন সম্পর্কে যারা জানেন সেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট যদি নির্বাচনে পরাজিত হন এবং সেই ফলাফল নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে, তাহলে তিনি পরাজয় স্বীকার করলেন কি করলেন না – তাতে কিছু এসে যায় না।

নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী পরাজয় স্বীকার করেন জয়ী প্রার্থীকে একটা ফোন করে এবং সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতার মাধ্যমে। নিকট অতীতে হিলারি ক্লিনটন, জন ম্যাককেইন, এ্যাল গোর, জর্জ এইচ বুশ – সবাই তাই করেছেন।

অবশ্য হিলারি ক্লিনটন নির্বাচনে মি. ট্রাম্পের কাছে হারার পর তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্টকে প্রথম দিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ফলাফল খুব অল্প ব্যবধানের হলে পরাজয় স্বীকার না করে ঘটনা কোন দিকে যায় তা দেখতে।

তবে এই পরাজয় স্বীকার করা একটা আনুষ্ঠানিকতা বা রাজনৈতিক সৌজন্য মাত্র – এর কোন আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

২০শে জানুয়ারির পর কী হতে পারে

ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২১ সালের ২০শে জানুয়ারি দুপুর ১২টায়।

“এর পর তিনি আর প্রেসিডেন্ট থাকবেন না, যদি না তিনি দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচনে জয়লাভ করেন।”

তিনি বলছেন, আগামী ২০শে জানুয়ারি মি. ট্রাম্পের বর্তমান ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবে এবং সেসময়ই ২০২০-এর নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী শপথ নেবেন এবং শপথ নেবার সাথে সাথে তিনিই প্রেসিডেন্ট হবেন।

হোয়াইট হাউজ অনেকটা ফাঁকা বলে জানাচ্ছেন সংবাদদাতারা
ছবির ক্যাপশান,হোয়াইট হাউজ অনেকটা ফাঁকা বলে জানাচ্ছেন সংবাদদাতারা

এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সাধারণত: কংগ্রেস ভবনের সামনে হয়ে থাকে, কিন্তু আইনগতভাবে এরও কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

অধ্যাপক ড. রীয়াজ বলছেন, আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নিতে পারেন।

পরাজিত প্রার্থী নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকেন, যেমনটা মি. ট্রাম্পের শপথের দিন ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। তবে জো বাইডেন যদি জিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে মি. ট্রাম্প জো বাইডেনের শপথে উপস্থিত থাকবেন কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয় ।

ট্রাম্প হারলে তাকে কি হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দেয়া হবে?

যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মি. ট্রাম্প ভোটের ফলাফলে হেরে গেলেও হয়তো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ এনে আইনি লড়াই চালানোর চেষ্টা করতে পারেন, তবে সেসব মামলায় তেমন কোন কাজ হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মি. ট্রাম্প যাই করুন – আগামী ২০শে জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগ সহ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নতুন প্রেসিডেন্টের হাতেই চলে আসবে।

মি. বাইডেন নতুন প্রেসিডেন্ট হলে তিনি চাইলে মি. ট্রাম্পকে তখন হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দেবার নির্দেশ দিতে পারবেন।

উল্লেখ্য, জো বাইডেন নিজেই একবার বলেছিলেন যে তিনি নিশ্চিত করছেন যে মি. ট্রাম্প হেরে যাবার পর হোয়াইট হাউস ছাড়তে না চাইলে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে।

অবশ্য সিক্রেট সার্ভিস ঠিক কী করবে তা এখনো স্পষ্ট নয় তবে তারা এখনই জো বাইডেনকে নিরাপত্তা দিতে শুরু করেছে।

তাহলে কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নির্বাচনের ফল না মানা এবং এর বিরুদ্ধে যে আইনি লড়াইয়ের কথা বলছেন – সেগুলো কি সবই ফাঁকা বুলি?

ফলাফল চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ

তার হাতে কি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কোন পথই নেই?

বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু জটিল আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে এখনও একটা সংকট তৈরি হবার সম্ভাবনা আছে।

সংকট কীভাবে তৈরি হতে পারে?

সবশেষ ভোট গণনার খবর অনুযায়ী – ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পাবার দৌড়ে এগিয়ে আছেন জো বাইডেন ।

তবে সংবাদমাধ্যমে নির্বাচনের খবর জানানো আর আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা এক কথা নয়।

তাহলে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে বিজয়ী হলেন তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হবে কখন ও কীভাবে?

এটা আসলে বেশ দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, “এখন পপুলার ভোটগুলো গোণা হচ্ছে । এই গোণা যখন শেষ হবে তখন তা দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সার্টিফাই করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা করে থাকেন অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর বা সেক্রেটারি অব স্টেট।”

এর পর ১৪ই ডিসেম্বর পপুলার ভোটের ভিত্তিতে রাজ্যগুলোর ইলেকটোরাল কলেজের সদস্যরা সমবেত হয়ে তাদের ভোটগুলো দেবেন।

সাধারণত নিয়ম হলো – একেকটি রাজ্যে পপুলার ভোটে যে প্রার্থী বিজয়ী হন তিনিই ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান। সেকারণেই পপুলার ভোটের ফল জানার সাথে সাথেই সবাই ধরে নেন যে ইলেকটোরাল ভোটের ফল কী হবে।

মার্কিন কংগ্রেস
ছবির ক্যাপশান,সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে কংগ্রেসের ভুমিকা হবে গুরুত্বপূর্ণ

কিন্তু এ ক্ষেত্রে কি এমন কিছু ঘটতে পারে যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে গিয়েও ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে পারেন?

কী ঘটতে পারে?

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, এ ক্ষেত্রে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে দু দিকে সমস্যা হতে পারে।

তিনি বলছেন, এমন হতে পারে যে ভোটগণনায় যে ফল পাওয়া গেল – তা অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষ সার্টিফাই করলেন না। তবে এর সম্ভাবনা কম, এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে রাজ্যগুলোর ফল নিয়ে আপত্তি করছেন – সেগুলোও হয়তো অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ সার্টিফাই করবেন।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হতে পারে ইলেকটোরাল কলেজ নিয়ে।

অধ্যাপক রীয়াজ বলছেন, ইলেকটোরাল কলেজের সদস্য নির্ধারণ করার দায়িত্ব হচ্ছে অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভার।

আইনসভাগুলো চাইলে জো বাইডেনের সমর্থক প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দমত ইলেকটোরাল কলেজের প্রতিনিধিদের ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারেন।

সেক্ষেত্রে ইলেকটোরাল ভোটের দুটো স্লেট হতে পারে একটা হচ্ছে যা আসলেই পপুলার ভোটের রায় প্রতিফলিত করবে – আরেকটি রাজ্যের আইনসভাগুলোর আলাদা করে পাঠানো রায়।

তারা যে ভোট দেবেন তা আবার গোণা হবে জানুয়ারির ৬ তারিখ কংগ্রেসে। কংগ্রেসের সেই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। তিনি যদি ইলেকটোরাল কলেজের ভোটগুলোর দুটি স্লেটের একটা রেখে অন্যটা ফেলে দেন বা দুটোর কোনটাই গ্রহণ না করেন – তাহলে একটা সাংবিধানিক সংকট দেখা দিতে পারে।

সংকটটা হলো – ভাইস প্রেসিডেন্ট দুটো স্লেটই প্রত্যাখ্যান করলে কোন প্রার্থীরই ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট হবে না। সেক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা নির্ধারণ করবে কংগ্রেস।

“সেক্ষেত্রে প্রতিটা অঙ্গরাজ্য একটা করে ভোট পাবে। কিন্তু বর্তমানে ২৩টি অঙ্গরাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে ডেমোক্র্যাটদের, ২৬টিতে রিপাবলিকানদের। এভাবে ভোট হলে ২৬টি ভোট পেয়ে যাবেন ট্রাম্প, এবং তিনিই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন। এটা হবে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। তবে হাউজের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি হয়তো এ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে বা থামিয়ে দিতে পারেন, তাহলে এক পর্যায়ে হয়তো তার হাতে দায়িত্ব এসে পড়তে পারে।”

রিপাবলিকান পার্টি ও ভাইস প্রেসিডেন্টের ভূমিকাই আসল

এ‌ই জটিল আইনি পরিস্থিতিতে রিপাবালিকান পার্টির ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে যে দেশ কোন সাংবিধানিক সংকটের মধ্যে পড়ে যায় কিনা।

ভোট জালিয়াতির যে প্রশ্ন তুলছেন ট্রাম্প – তা কতটা বড় সংকট তৈরি করতে পারে?

জো বাইডেন বলছেন, তিনিই নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছেন
ছবির ক্যাপশান,জো বাইডেন বলছেন, তারাই নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছেন

ড. আলী রীয়াজ বলছেন, “বিশেষত পোস্টাল ভোটে যে জালিয়াতির কথা মি. ট্রাম্প বলছেন, তা তাকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু তার পক্ষের লোকজনের করা এরকম অনেক মামলাই রাজ্য পর্যায়ের আদালতে গৃহীত হচ্ছে না। “

তবে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলছেন, মি. ট্রাম্প আসলে যেতে চাইছেন সুপ্রিম কোর্টে।

“এ ক্ষেত্রে তার একমাত্র পথ হচ্ছে পেনসিলভেনিয়ার আদালতে পোস্টাল ভোটের জন্য তিনদিন পর্যন্ত সময় দেবার ব্যাপারে একটি রায় দেয়া হয়েছিল – যে রায়ের ফুটনোটে একটি মন্তব্য আছে যে রাজ্য পর্যায়ের সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখছে, কিন্তু তা ‘আপাতত:’ – নির্বাচনের পরে এ মামলায় আবার ফিরে যাওয়া যেতে পারে। “

এ কারণে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটা আবার নিতে পারে, কিন্তু সে ক্ষেত্রে এ রায়ের কারণে যাদের পাঠানো পোস্টাল ভোট নির্বাচনের পরের তিনদিন পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে – সেই ভোটারদের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হবে। সেটা আরেক ধরণের সংকট তৈরি হতে পারে।

এগুলোকে কেন্দ্র করে কি কোন অস্থিরতা বা সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে?

ড, আলী রীয়াজ বলছেন, সেই সম্ভাবনা আছে।

মি. ট্রাম্প তার সমর্থক শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা মিলিশিয়াদের পথে নেমে আসার জন্য টুইটারে আহ্বান জানাতে পারেন ।

সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্নটা হবে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ এবং ন্যাশনাল গার্ড কী ভূমিকা পালন করে।

মি. ট্রাম্প কি করছেনএখন?

জানা যাচ্ছে, মি. ট্রাম্পের মেজাজমর্জি ভালো নেই। তিনি হোয়াইট হাউজে তার বাসভবন এবং ওভাল অফিসে সময় কাটাচ্ছেন, টিভি দেখছেন, নানাজনকে ফোন করছেন।

তার সমর্থকরা সেভাবে রাস্তায় নামছে না দেখে তিনি ক্ষুব্ধ।

হোয়াইট হাউস অনেকটা ফাঁকা, অনেকে কাজে আসেনি।

প্রেসিডেন্ট তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের বলছেন যে তিনি আইনি চ্যালেঞ্জের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবেন।

সূত্রঃ BBC